নীতি-আদর্শ না থাকলে নেতা হওয়া যায় না: প্রধানমন্ত্রী

3090
নীতি-আদর্শ না থাকলে নেতা হওয়া যায় না: প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নীতি-আদর্শ না থাকলে নেতা হওয়া যায় না। কোনোভাবে হলেও তা সাময়িক। সেই নেতৃত্ব দেশকে কিছু দিতে পারে না। কাজেই মানুষের ভালোবাসা-আস্থা অর্জন করতে হবে। এটিই রাজনীতিকের জীবনের একমাত্র সম্পদ। শনিবার শোক দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। গণভবনে অনুষ্ঠিত এ সভায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শোককে বুকে নিয়ে, ব্যথা-বেদনা বুকে চেপে রেখে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে আমরা কাজ করেছি ।

ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া রাখিনি। যে জাতির জন্য বাবা জীবন দিয়ে গেছেন, তাদের জন্য কতটুকু করতে পেরেছি, সেই বিবেচনা করেছি। যদি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে হয় তবে তার মতো ত্যাগী কর্মী হিসেবে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ অনেকে বাকশাল-বাকশাল বলে গালি দেয়, আসলে বাকশালটা কী ছিল? এটা ছিল কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, এই বাংলাদেশ ছিল কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাদ্য উৎপাদন করে, শ্রমিকের শ্রমের মধ্য দিয়ে এ দেশের অর্থনীতি গড়ে ওঠে।

এই কৃষক-শ্রমিককে এক করে সমগ্র বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশ অনেক আগেই বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে থাকত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমগ্র বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ১৯ জেলাকে ৬০ জেলায় রূপান্তর করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে তৃণমূলের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

যেন সেগুলো অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠে এবং তৃণমূলের মানুষ সেটার সুফল পায়।

গণতন্ত্র-ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে তৃণমূল পর্যন্ত যেন সেটা পৌঁছে যায় সে ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন সাধারণ মানুষের যেন বলার সুযোগ থাকে, কাজ করার সুযোগ থাকে- সে পদ্ধতি তিনি বেছে নিয়েছিলেন। যারা জমিতে শ্রম দেবে তারা উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ পাবে।

যারা জমির মালিক তারা একটা অংশ পাবে এবং কো-অপারেটিভের মাধ্যমে সরকারের কাছে একটা অংশ আসবে। যেন কখনও কেউ বঞ্চিত না হয়। অন্তত যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলায় তারা যেন ন্যায্যমূল্য পায়, তারা যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কৃষি পদ্ধতিটাকে যান্ত্রিকীকরণ করে আধুনিকীকরণ করার কথাই তিনি বলেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রাইমারি শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থা এবং নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন।

সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, তিনি সে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রত্যেকটা ইউনিয়নে ১০ বেডের হাসপাতাল করে প্রত্যেকের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়ার কাজ তিনি শুরু করেছিলেন।

জাতির পিতা যে কর্মসূচিগুলোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, এগুলো যদি তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারতেন তাহলে বাংলাদেশ অনেক আগেই বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন হতো।

জাতির জনকের কন্যা বলেন, বঙ্গবন্ধু যাদের ভালোবাসতেন তাদের কল্যাণ করা সন্তান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ৩২ নম্বরে যখন বাবাকে হত্যা করা হয়, খুনিরা মাকে বলেছিল, চলেন।

তিনি এক পাও নড়তে রাজি হননি, জীবন ভিক্ষা চাননি। বীরের মতো বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড়সন্তান হিসেবে বাবার স্বপ্ন, লক্ষ্য আমি জানতাম। সেগুলো সামনে নিয়েই আমার পথচলা শুরু। স্বাধীনতার পর অনেকেই বলেছিল, এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ব্যর্থ রাষ্ট্র হবে। আমার জিদ ছিল বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব যাতে বিশ্ববাসী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখে!

মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার (বঙ্গবন্ধু) পাশে আমার মা সব সময় ছিলেন। প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেননি, ছবি তোলেননি, নাম ছাপেননি। বাবার সঙ্গে থেকে প্রতিটা কাজে সহায়তা করেছেন।

সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। বছরের পর বছর বাবা যখন কারাগারে, মা অপেক্ষা করেছেন। পাশে থেকে সহযোগিতাও করেছেন। এমনকি ছদ্মবেশে ছাত্রনেতাদের কাছে নির্দেশ পৌঁছে দিতেন, নির্দেশনাও দিতেন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় গেরিলা।

দিনরাত ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা সংস্থার লোক থাকত। তারা কোনোদিন ধরতে পারেনি আমার মা কোথায় কীভাবে যাচ্ছেন। প্রত্যেক আন্দোলন কীভাবে সফল করতে হয়, তা মায়ের কাছ থেকে শিখেছি।

তিনি বলেন, কখনই আমার মা কারাগারে গিয়ে আমার বাবার কাছে হতাশার কথা বলেননি। শুধু বলেছেন- তোমাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না। যত সমস্যা আমি দেখব। এই যে পাশে থেকে একটা শক্তি জোগানো, সাহস জোগানো, আশ্বস্ত করা- সব সময় আমার মা করে যেতেন।

বঙ্গবন্ধুর লেখা ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রকাশিত নথিপত্র ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পড়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরও একটি বইয়ের কাজ চলছে। ১৯৫২ সালে শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু চীনে গিয়েছিলেন।

পুরো পাকিস্তান থেকে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ কীভাবে সেখানে বিপ্লব করেছে, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা তিনি দেখেছেন, অনুভব করেছেন এবং লিখেছেন।

দীর্ঘ সংগ্রামের পথে অনেক দালাল ছিল, যারা পাকিস্তানপ্রেমী ছিল, তারা বাংলার মানুষের ভালো চায়নি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের একাত্তরের ভূমিকা সবার জানা। তাদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন।

তিনি বেঁচে থাকলে ১০ বছরের মধ্যে উন্নত ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠত।

৭৫-এর স্মরণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিন তারা ছোট্ট রাসেলকেও ছাড়েনি, যাতে রক্তের উত্তরাধিকারী একজনও জীবিত না থাকে। আমার ভাড়াবাসাতেও আক্রমণ চালিয়েছিল তারা।

আমরা অল্প সময়ের জন্য দেশের বাইরে গিয়েছিলাম। আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য একই দিনে আমরা পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালি জাতি ছিল শোষিত-বঞ্চিত, নির্যাতিত-নিপীড়িত। তিনি বলেন, যে বাংলাদেশ সব সময় অবহেলিত ছিল, ক্ষুধায় অন্ন পেত না, শিক্ষা-চিকিৎসা পেত না, থাকার ঘরবাড়ি ছিল না, সেই মানুষগুলোর জীবন বদলে দিতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব। ছাত্রাবস্থায় গরিব ছাত্রদের সহায়তা করতেন। সব সময় দেশকে স্বাধীন করে মানুষের উন্নয়নের চিন্তা করতেন।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এ সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।