আল্লাহর কুদরতি সৃষ্টির রহস্য তিনিই ভালো জানেন

3090
আল্লাহর কুদরতি সৃষ্টির রহস্য তিনিই ভালো জানেন

দৃশ্য-অদৃশ্য বস্তুর সমন্বয়ে মানুষ গড়া হয়েছে। মানুষ চোখ মেলে সর্বপ্রথম দেখে নিজেকে ও কাছের বস্তুগুলো তারপর আকাশ।

প্রথম আসমান : তারকারাজি সজ্জিত প্রথম আসমান। যার সামান্য অংশই চোখে অথবা আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে দেখা যায়।

দ্বিতীয় আসমান (অদৃশ্য)/তৃতীয় আসমান (অদৃশ্য)/চতুর্থ আসমান (আদৃশ্য)/পঞ্চম আসমান (অদৃশ্য)/ষষ্ঠ আসমান (আদৃশ্য)/সপ্তম আসমান (অদৃশ্য)

বাইতুল মামুর (অদৃশ্য) : এটি মালাইকাদের (আলাইহিমুস সালাম) জিয়ারত ও সালাত আদায়ের মসজিদ। একেকজন ফেরেশতা সমগ্র হায়াতে একবার মাত্র এ মসজিদে সালাত আদায়ের সুযোগ পান।

সিদরাতুল মুনতাহা (অদৃশ্য) : সিদরাতুল মুনতাহার ডান পাশে আলাল ইল্লিয়্যিন। এখানে মানুষের ওফাতের পর নেককার বান্দাদের আরওয়াহ রাখা হয়। আর বদকার লোকের আরওয়াহ রাখা হয় জাহান্নামের সর্বনিু স্তরে তাহাতাস্সারার সিজ্জিনে। নেককার বান্দার নফসে মুতমাইন্না অর্জন হয়। বদকার লোকের নফস কবরেই থাকবে। যেহেতু আব (পানি) খাক (মাটি) বাদ (বায়ু) এবং আতশের (আগুন) সমন্বয়ে মানুষের দেহ গড়া। (জীবাত্মাই নফ্স)

জান্নাত : জান্নাত ৮টি। ৮টি জান্নাতের পর থেকে ৭০ হাজার নুরের পর্দা বিরাজমান।

আরশে আজিম : আল্লাহ আরশে আজিমের রব। যেভাবে অন্যান্য মহাসৃষ্টির রব আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আল্লাহতায়ালার হুকুমগুলো আরশে আজিমের মাধ্যমে নিু জগতে জারি হয়। ইস্তিওয়া (আরশে সমাসীন হওয়া) আল্লাহতায়ালার কালামে পাকের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি; কিন্তু এর প্রকৃত হাকিকত আল্লাহই ভালো জানেন।

লওহে মাহফুজ : সৃষ্টি জগতের সব কিছু তথ্য এখানে লেখা আছে।

আলমে আরওয়াহ্ : আল্লাহতায়ালা আরওয়াহ্ একসঙ্গে সৃষ্টি করে এখানে রেখেছেন। পর্যায়ক্রমে আল্লাহর হুকুমে রুহ্গুলো মায়ের উদরে পাঠানো হয়।

আলমে মেসাল (প্রতিরূপ জগৎ) : দৃশ্য-অদৃশ্য সৃষ্টিগুলোর (বিশেষ করে জিন ও মানুষের) কর্মকাণ্ডের একটি।

অদৃশ্য প্রতিরূপ সুরত (প্রতিচ্ছবি) এখানে রক্ষিত। এটা কখনও লয় ও ক্ষয় হবে না। হাশরের ময়দানে তা বাস্তব রূপ ধারণ করবে যেন আল্লাহতায়ালার কুদরতি সিসি ক্যামেরা।

আলমে আমর : আল্লাহতায়ালার কুদরতি হুকুমের জগৎ। ওই জগৎকে আলমে জাবারুত (আল্লাহর মহাশক্তির জগৎও বলা হয়)।

ওয়াজেবুল অজুদের নুর : আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট নুর। আল্লাহর সিফাতি নুরের জিল্লি নুর (নুর-ই-খালক)।

আল্লাহতায়ালার আলমে গায়েবও আলমে শাহাদতের অস্তিত্ব আল্লাহর কুদরত (মহাশক্তির) বাস্তব প্রমাণ। মহাসৃষ্টির অস্তিত্বদান, পয়দাকারী হিসেবে আল্লাহর জাত (সত্তা) ওয়াজেবুল অজুদ। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার রহস্যময় বাতেনি ও জাহেরি সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় শিরকমুক্ত আল্লাহর কুদরতি বিকাশের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সুশৃঙ্খল ঐক্য বিরাজ করছে। তৌহিদ রিসালত ও আখিরাতে ইমান (ইয়াকিন) ইসলাম ধর্মের মৌলিক ভিত্তি। বাতেনি ও জাহেরি সৃষ্টিগুলো আল্লাহর ওয়াহদানিয়ত (একত্বের) সাক্ষী। গুপ্ত ও ব্যক্ত সৃষ্টিগুলো আল্লাহর একত্বের সাক্ষী ও বাস্তব প্রমাণ। এ আলোচনা ইমানের (ইয়াকিন) বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত।

(সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা) : ওয়াজেবুল অজুদের নুর আল্লাহর সিফাতগুলোর সম্মিলিত প্রতিবিন্ব (ছায়া) নুর।

আরবিতে বলা হয় জিল্লিনের অজুদি নুর। আল্লাহ মাখলুকের মিসাল থেকে পবিত্র, তারপরও বলা যেতে পারে যেমন মানুষের হুবহু একটা ছায়া থাকে; কিন্তু ছায়া ও মূল মানুষ এক নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বাতেনি ও জাহেরি কুদরতি বিকাশ আল্লাহর দয়া ও মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ। বাতেনি জগৎ সম্পর্কে কিছুটা মেসালি অনুভব করা যেতে পারে অন্তর জগতের মাধ্যমে। (প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন)। আল্লাহু আ’লামু।

আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের নুর : আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাত অসংখ্য। তবে ইসলামী শরিয়ত ও কোরআন হাদিসে কিছু আসমা ও সিফাতের বর্ণনা আছে। আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের হাকিকত আল্লাহর জাতে পাকের সঙ্গে মিশ্রিত (তা হক্কুল ইয়াকিন) যেমন সূর্যের আলো সূর্য নয়; কিন্তু মূল সূর্য থেকে আলাদা নয়। আল্লাহ মাখলুকের মিসাল থেকে পবিত্র (আল্লাহু আ’লামু)।

আল্লাহতায়ালার জাত (সত্তা) নুর : আল্লাহু (হুআল্লাহু)-এর আসমা ও সিফাত জাত নয়। জাতে পাক থেকে আলাদা নয়। আল্লাহ তার পাক কালামের মাধ্যমে নিজকে যেভাবে প্রকাশ করেছেন তার ওপর জিকির ও ফিকির ছাড়া আল্লাহ জাতে পাকের প্রকৃত মারেফাত ও হাকিকত বোঝার ও আয়ত্ত করার ক্ষমতা মানব জাতি, জিন ও মালাইকাহ্ (ফেরেশতা) কুলের সাধ্যাতীত। খালেক মাখলুকের ব্যবধান হামেশা বিরাজ করছে এবং মহাবিশ্ব লয় হওয়ার পরও বিরাজ করবে। আল্লাহ নুরের সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহর জাতি (সত্তা) এবং সৃষ্ট নুর এক নয়। মাখলুকের মধ্যে সরাসরি হুলুল (অনুপ্রবেশ করা) থেকে আল্লাহর জাত পবিত্র। দুর্বোধ্য ও জটিলতার অবকাশ এখানে নেই। আল্লাহ আ’লামু (প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন)।

লা-জামান লা-মাকাম : ওই রহস্যময় জগতের রহস্য আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

বি. দ্র. আল্লাহ হাইয়্যুল কাইয়্যুম। আল্লাহতায়ালার কুদরত (মহাশক্তি) আফয়াল (কার‌্যাবলি) ইলম (মহাজ্ঞান) ইরাদা (ইচ্ছা) তথা সিফাতি নুরের মাধ্যমে মহাবিশ্বকে বেষ্টন করে আছেন। আর সৃষ্টিজগৎ হচ্ছে জাতি ও সিফাতি নুরের জিল্লিন।

জিল্লিনের ব্যাখ্যা : স্বচ্ছ পানির মধ্যে নারিকেলসহ নারিকেলগাছ দেখা যায়। প্রকৃত পক্ষে তা নারিকেলগাছ ও নারিকেল নয়। এর প্রতিবিম্ব ছায়া (জিল্লিন)। বলা যায় চন্দ্রের আলো। সুতরাং হাকিকত এই যে, আল্লাহ (আজ্জা ও জাল্লা) বস্তুর সঙ্গে শিরক থেকে পবিত্র। আমরা শিরক ও কুফর থেকে আল্লাহতায়ালার কাছে পানাহ্ চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জাত গুপ্ত। আল কোরআনের সূরা হাদিদ-৩ (তিন) আয়াত। মূল আয়াতের বাংলা উচ্চারণ : হুওয়াল আউওয়ালু ওয়াল আখিরু ওয়াজ্জাহিরু ওয়াল বাতিনু ওয়া হুওয়া বিকুল্লি শাইয়িন আ’লিম। সূরা হাদিদ-৩ আয়াতের মর্মানুযায়ী ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা গেল-

বাংলা উচ্চারণ : লা-আউওয়ালা ইল্লাল্লাহ, লা-আখিরা ইল্লাল্লাহ, লা-ক্বাদিরা ইল্লাল্লাহ, লা-বাতিনা ইল্লাল্লাহ, লা-আ’লিমা ইল্লাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

প্রকৃত হাকিকত : আল্লাহ ছাড়া আল্লাহর আগে কিছুই নেই, আল্লাহ ছাড়া আল্লাহর শেষে কিছ্ইু নেই, আল্লাহ ছাড়া মহাশক্তিশালী কেউ নেই (জাহেরি বাতেনি মহাজগৎ ও এর মধ্যে যা কিছু আছে পয়দা করা আল্লাহর কুদরতের চাক্ষুস প্রমাণ বহন করে), আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত গুপ্ত কেউ নেই, আল্লাহ ছাড়া মহাজ্ঞানী কেউ নেই (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)।

শরীরধারী মানুষের সীমিত শক্তি, সীমিত জ্ঞান আল্লাহর দান ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ (আলহামদুলিল্লাহি আলা যালিকা)।

বাতেনি জগতের আংশিক বাস্তব সত্য অবস্থা জারি হবে আলমে বরযখ (কবর জগৎ) থেকে। পরিপূর্ণ বাস্তব অবস্থা জারি হবে কেয়ামতের পর হাশরের ময়দানে। জাহেরি জগতের চেয়ে বাতেনি জগতের বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি ও চিরস্থায়ী। উপস্থাপিত খালেক মাখলুক সম্পর্কিত বর্ণনার প্রকৃত হাকিকত আল্লাহই ভালো জানেন। (আল্লাহু আলামু, আল্লাহু আ’লামু বিমুরাদিহী)।