কাউন্সিলরদের ভোটেই হবে বিএনপির নেতা নির্বাচন

3090
কাউন্সিলরদের ভোটেই হবে বিএনপির নেতা নির্বাচন

দল পুনর্গঠনের নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েছে বিএনপি। প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ‘সুপার ফাইভ’ বা ‘সুপার সেভেন’ কমিটি আর হচ্ছে না। এখন থেকে কাউন্সিলররা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত করবেন। ১৪ সেপ্টেম্বর বিএনপির অন্যতম সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, যাকে এসিড টেস্ট হিসেবে নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। ছাত্রদলের কাউন্সিলে এ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে শুরু করা গেলে পরে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক জেলাতেও সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।

এ প্রক্রিয়ায় কমিটি হলে যোগ্য ও ত্যাগীরাই শীর্ষ নেতৃত্বে আসবেন বলে মনে করেন দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, এর ফলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে, দল হবে সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত।

যদিও একটি সিন্ডিকেট কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন তথা কাউন্সিল ভণ্ডুলে মাঠে নেমেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাত্রদলের সম্মেলন যাতে সুষ্ঠুভাবে না হয় সেজন্য নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছেন ওই সিন্ডিকেটের নেতারা। হাইকমান্ডকে তারা ভুল বার্তা দিচ্ছেন।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সরাসরি ভোটে নেতা নির্বাচিত হলে দলে ওই সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকবে না। যারা বিভিন্ন কমিটিতে শীর্ষ পদে আসতে চান তারা আর সিন্ডিকেটের কাছে ধরনা না দিয়ে কাউন্সিলরদের মন জয়ে ব্যস্ত থাকবে।

এমন পরিস্থিতিতে দলে প্রভাব ধরে রাখতে নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে সিন্ডিকেট। তবে কোনো সিন্ডিকেটের কাছে মাথা নত না করে এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে দলটির হাইকমান্ড কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত ও দলে গতি ফেরাতে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা অঙ্গ ও মূল দলের কমিটিগুলো আপডেট করছি। কাউন্সিলের মাধ্যমে এসব কমিটি করা হবে।

যাতে যোগ্য ও ত্যাগীরা নেতৃত্বে আসতে পারেন। তিনি বলেন, অতীতেও আমরা বারবার ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছি। কোথাও কোথাও করেছি। কিন্ত রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি।

বিএনপির গঠনতন্ত্রে প্রতিটি কমিটি কাউন্সিলরদের ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দলে এ চর্চা নেই। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র- সব জায়গায় চাপিয়ে দেয়া কমিটি দিয়েই চলছে দলটি। গত জাতীয় কাউন্সিলের আগে চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিয়মমাফিক নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

এ দুই পদে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বাকি কমিটিগুলো করার দায়িত্ব কাউন্সিলররা চেয়ারপারসনের ওপর ন্যস্ত করেন। চেয়ারপারসন তার ক্ষমতাবলে বিএনপির কেন্দ্রীয়সহ বিভিন্ন সাংগঠনিক জেলা ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতা নির্বাচন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ নেয়া হয়।

কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এসব কমিটিতে যোগ্য ও ত্যাগীরা বাদ পড়েন। সুবিধাবাদীরা শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসে। এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দলটির হাইকমান্ড একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পরামর্শ নেন। প্রায় সবাই সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের পক্ষে মত দেন। এরই ধারাবাহিকতায় কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও ছাত্রদলের নির্বাচিত সভাপতি রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, সহযোগী সংগঠন হলেও বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হচ্ছে ছাত্রদল। ছাত্রদলের কাউন্সিল সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে বাকি কমিটি করতে তেমন বেগ পেতে হবে না।

নেতাকর্মীরাও নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করবে। তাই ছাত্রদলের আসছে কাউন্সিলকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছি। প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচিত হলে দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ার পাশাপাশি গতি আসবে বলে মনে করেন তিনি।

বিএনপি সূত্র মতে, কাউন্সিল করার জন্য এরই মধ্যে কয়েকটি সংগঠন ও সাংগঠনিক জেলার আগের কমিটি বিলুপ্ত করে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। আহ্বায়ক কমিটির নেতারা কাউন্সিলে প্রার্থী হতে পারবেন না। তারা কাউন্সিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব পালন করবেন।

এছাড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করে বছরের পর বছর নেতা থেকে যাওয়ার ব্যবস্থাও থাকছে না। কারণ বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে কাউন্সিল করতে না পারলে আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করার বিধানও রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু যুগান্তরকে বলেন, তৃণমূল থেকে নেতা নির্বাচিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সে অনুযায়ী ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা, পৌর, জেলা-মহানগরে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটি হবে। অঙ্গসংগঠনগুলোতে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভোটের মাধ্যমে সব স্তরে যোগ্য ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনা হবে যাতে কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে তারা মাথা নত না করে।

ছাত্রদলের সর্বশেষ কাউন্সিল (৫ম কাউন্সিল) হয়েছিল ১৯৯২ সালে, যার মাধ্যমে ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসেন রুহুল কবির রিজভী ও এম ইলিয়াস আলী। এরপর গত ২৭ বছর ছাত্রদলের সব কমিটি হয়েছে কেন্দ্র থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পকেট কমিটি করার কারণেই ছাত্রদলের এ অবস্থা। যোগ্য নেতৃত্ব না আসায় ঝিমিয়ে পড়েছে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। সিন্ডিকেটকে খুশি রাখতেই ব্যস্ত সবাই।

ফলে নতুন কর্মীর সংখ্যা সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে। সব ইউনিটে যোগ্য নেতাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় সরাসরি ভোটে শীর্ষ নেতা নির্বাচন করে ’আন্দোলনের ভ্যানগার্ড’ খ্যাত ছাত্রদলকে অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দল পরিচালনা করতে হলে নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন হতে হবে। কাউন্সিল করে সব স্তরে কমিটি গঠন করা হলে কারও কোনো আপত্তি থাকবে না। পকেট কমিটি হলে বিতর্কিত, ব্যর্থ ও সুবিধাবাদীরা স্থান পেয়ে যাবে।

জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজধানীর ধানমণ্ডি থানা বিএনপির সভাপতি শেখ রবিউল আলম রবি যুগান্তরকে বলেন, হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা প্রশংসাযোগ্য।

গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোটের মাধ্যমে দলের সর্বস্তরে পুনর্গঠন হবে, এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। এতে যোগ্য ও ত্যাগীরা জায়গা পাবে এবং দলে গতি আসবে।