নরেন্দ্র মোদি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নন

3092
নরেন্দ্র মোদি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নন

দিল্লিতে প্রচলিত ভাবনা হলো, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষ নরেন্দ্র মোদিকে ১১ এপ্রিল শুরু হওয়া জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করতে সহায়তা করবে। এটা ঠিক যে গোঁড়া হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের ওপর ক্রমেই তাঁর নজর তীক্ষ্ণ করেছেন এবং দিল্লিতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সময় নিজেকে কঠিন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থেকে দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করছেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশের অনেক সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ করেছেন।

কিন্তু ভারতের নির্বাচনে কখনোই একক প্রভাব বিস্তারকারী কোনো ব্যক্তিত্ব ছিল না, নেইও। এমনকি আগামী মাসে ফল বের হওয়ার পর যদি দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন, তাহলেও নয়। তাঁর দল হয়তো এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসন জিততে পারে কিন্তু এর বেশির ভাগই আসবে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো থেকে।

ভারতকে একটি দেশ নয়, বরং মহাদেশ বলা যেতে পারে। ভারত অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো। এর ২৯টি রাজ্য বিভিন্ন সম্প্রদায়, সংস্কৃতি ও ভাষা দ্বারা বিভক্ত এবং আঞ্চলিক নেতারা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের মধ্যে থাকেন। ভারতের এই অফুরন্ত বৈচিত্র্য যেকোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ব্যাপ্তিকে সীমিত করে ফেলে। উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পাকিস্তানবিরোধী অনুভূতি যতটা আছে, ভারতের বাকি অংশে তা নেই। এটা দেশটির ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য এমনকি মোদির মতো ক্যারিশমাটিক নেতার ক্ষমতাকেও সীমিত করে ফেলে। তাই দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার জন্য মোদির আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধা উচিত ছিল।

পশ্চিমে মহারাষ্ট্র এবং দক্ষিণে কর্ণাটকের মতো বিভিন্ন রাজ্যে শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য আমি মোদিকে সংগ্রাম করতে দেখেছি। কারণ, তাঁর হিন্দি ভাষা অনেকে বুঝতে পারছিলেন না। ভাষায় অলংকার পরাতে তিনি বেশ দক্ষ হলেও কর্ণাটকে সাম্প্রতিক নির্বাচনী সমাবেশে মোদির বক্তৃতায় খুব একটা সাড়া মেলেনি। কারণ, তাঁর ভাষা অনেকেই বোঝেননি। যদিও হিন্দি ভারতের জাতীয় ভাষা, কিন্তু ভারতীয়দের মাত্র ৪০ শতাংশই এ ভাষায় কথা বলে।

ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তার বৈচিত্র্যকে বাড়িয়ে তুলেছে, যা দিল্লি থেকে গোটা দেশকে শাসন করাটাকে কঠিন করে তুলেছে। ভারতের সংবিধানে রাজ্যের বিধানসভাগুলোকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকাণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব। ফলে কেন্দ্রের কর্তৃত্ব খুব একটা খাটে না। ভারতের ভোটাররা প্রথমে নিজেদের তামিল, মারাঠি বা বাঙালি হিসেবে দেখেন। এরপর তাঁরা নিজেদের ভারতীয় হিসেবে দেখেন। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ ও কেরালায় আঞ্চলিক আনুগত্য গভীরভাবে বিদ্যমান, যেখানে মোদি ও তাঁর দল বিজেপি ক্ষুদ্র খেলোয়াড়।

ভারতের অনেক রাজ্যে নির্বাচনে তিনটি অথবা চারটি বড় দল এবং কয়েক ডজন ছোট দল অংশ নেয়। তখন ভোটগুলো বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যায়। যেমনটি ঘটেছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে মোদির দল মাত্র ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিল। কারণ, বাকি ভোটগুলো অন্য আরও ১০০টি দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি উত্তরাঞ্চলের রাজ্যগুলোর বেশির ভাগ আসনে জিতেছিল, যেখানে মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিষয়টি বেশ ভালো প্রভাব ফেলেছিল। উত্তরাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বিজেপির জয় ছিল কংগ্রেসের জন্য একটি বড় আঘাত।

কিন্তু এখন সময়টা অন্য রকম। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস এখন মোদিকে থামানোর জন্য আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়ার চেষ্টা করছে। এই নির্বাচনে বেশ কয়েকজন আঞ্চলিক নেতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্ধ্র প্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু এবং ওডিশার নবীন পট্টনায়েক। মোদির মতো তাঁরা ভারতের বাইরে খুব একটা পরিচিত নন, কিন্তু তাঁরা নিজ নিজ রাজ্যে খুবই প্রভাবশালী এবং অনেকে তাঁদের ভারতের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে যে মোদি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নন।

একসময় যাঁরা পরস্পরের প্রতিপক্ষ ছিলেন, তাঁরাও এখন মোদির বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছেন। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। অথচ দলিতদের জনপ্রিয় নেতা মায়াবতী একটা সময় যাদবের পার্টিকে গুন্ডাদের দ্বারা পরিচালিত "ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ" বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁরা সব ভুলে এক জোট হয়ে মোদিকে থামানোর কাজে নেমে পড়েছেন।

কাজেই শুধু দেশের প্রতি প্রেম দেখিয়ে মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। তাঁকে অবশ্যই আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী চুক্তিতে আসতে হবে।