ব্যারিকেড ও বই: কাশ্মীরের এক বিদ্রোহী পাড়ার গল্প

3090
ব্যারিকেড ও বই: কাশ্মীরের এক বিদ্রোহী পাড়ার গল্প

স্টিল ব্যারিকেড ও রেজর তারের কুণ্ডলীতে ঘেরা কাশ্মীরি পাড়া আনচার। অল্প কয়েকজন লোকই পাড়াটি থেকে বাইরে বের হন। বাকিরা গ্রেফতারের ভয়ে ঘরেই থেকে যাচ্ছেন।

মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মীরে গত ৫ আগস্টের পর কঠোর যোগাযোগ অচলাবস্থা জারি করে রেখেছে মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় হিন্দুত্বাবাদী সরকার। বিক্ষোভকারীদের দমন করতেই স্থানীয়দের ওপর এই বিধিনিষেধ।

মূল শহর শ্রীনগরের এই পাড়াটি ঘনবসতিপূর্ণ, যাতে শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করেন। কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ার পর ভারতীয় দমনপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দুর্গ হিসেবে পরিচিত পায় এলাকাটি।

ধরপাকড় শুরু হওয়ার সাত সপ্তাহ পর হালকা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরলেও আনচারপাড়ায় অচলাবস্থা কমার লক্ষণ ন্যূনতম দেখা গেছে। এলাকাটিতে ১৫ হাজারের মতো মানুষের বসবাস।

পাড়াটির প্রবেশ পথগুলোতে গাছের গুঁড়ি, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও কাঁটাতারের ব্যারিকেড বানিয়ে তাতে পাহারা দিচ্ছেন তরুণরা। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারেন, তা প্রতিরোধেই গ্রামবাসীর সর্বাত্মক চেষ্টা।

ভারতীয় বাহিনীর যানবাহন প্রবেশে বাধা দিতে গলিপথগুলোতে মাটি খুঁড়ে বড় বড় গর্ত করে রাখা হয়েছে।

রাত পড়তে শুরু করলে তারা মুখোশ পরে হাতে পাথর ও গাছের ডাল নিয়ে বের হন। শুকনো লতাপাতায় আগুন জ্বেলে চারপাশে গোল হয়ে বসে পড়েন। প্রতিবেশীরা চা দিলে তা পান করতে থাকেন অবরত।

১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ফজল বলেন, আমরা রাত ঘরের বাইরে কাটাই। পরিবারকে রক্ষা করতে রাত জেগে পাহারা দিই, ভারতীয়রা যাতে আমাদের পাড়ায় ঢুকে নৃশংসতা চালাতে না পারে।

গাছের মোটা ডাল হাতে কিশোরটি বলল, এখানে আমার কোনো আতঙ্ক নেই। তল্লাশিচৌকি থেকে সে বাইরের সড়ক পর্যবেক্ষণ করছিল।

নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার কারণে উপত্যকাটির জমি বাইরের কেউ কিনতে কিংবা সরকারি চাকরিও করতে পারতেন না। এবার স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা বাতিলে সেই দুয়ার খুলে গেছে।

১৯৮৯ সালে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে ৪০ হাজার লোক নিহত হয়েছেন। বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর রাজ্যটিতে চার হাজার লোককে গ্রেফতার করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে কাশ্মীরের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। সাত সপ্তাহের পর রাজ্যটিতে সামান্য স্বাভাবিকতা ফিরেছে। কোথাও কোথাও দোকানপাটও খোলা শুরু হয়েছে।

কিন্তু আনচারপাড়াটিতে কোনোভাবেই ঢুকতে পারছে না ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। সেখানকার সরকারি সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে।

কিন্তু লোকজন বেঁচে থাকার তাগিদে কিছু একটা করার চেষ্টা করছেন। চার কলেজশিক্ষার্থী মিলে একটি অস্থায়ী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিন কক্ষের একটি ঘরে রোজ ২০০ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন তারা।

চরম অচলাবস্থার মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা। বই হাতে স্কুলে এসে ছড়া থেকে গণিত শিখছে মাথা কাপড় দিয়ে ঢাকা কন্যাশিশুরা।

কলেজশিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হওয়া আদিল বলেন, রাজ্যজুড়ে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে এই বসতিতেও। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেষ হতে দিতে পারি না আমরা।

ওয়ালিদ নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এখানকার শিশুরা প্রতিদিন বুলেট ও ছররা গুলি দেখছে।

গ্রেফতারের ভয়ে গ্রামটির লোকজন বাইরে যেতে পারেন না। এতে শিক্ষার্থীরা স্থানীয়দের চিকিৎসাসেবাও দিচ্ছেন।

রুবিনা নামে এক নারী জানান, তার ১৫ বছর বয়সী কিশোর ছেলে বুলেটবিদ্ধ হয়েছে। শুক্রবার জুমা শেষে বাড়িতে ফেরার পথে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাকে গুলি করে।

কিশোরটির মাথায় ভারী ব্যান্ডেজ। ঘটনার পর থেকে সে কোনো কথা বলতে পারছে না। কিন্তু শহরের হাসপাতালে নেয়ার বদলে বাড়িতেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তার।

বাইরে গেলেই পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে যাবে। এই অনিরাপত্তাই তাকে ঘরে থাকতে বাধ্য করছে।

রুবিনা আরও বলেন, তার ছেলেকে যদি বাইরের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, তবে ছয় থেকে সাত নারীকে সঙ্গে দেয়া হয়, যাতে ভারতীয় বাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে না পারে।