যার কল্যাণে ঢাকার কাউন্সিলর ক্যাসিনো সাঈদ

3090
যার কল্যাণে ঢাকার কাউন্সিলর ক্যাসিনো সাঈদ

রাজধানীতে মাদক ও ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ার পর গা ঢাকা দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের (ক্যাসিনো সম্রাট) শিষ্য তিনি। ঢাকায় সম্রাটের অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা দেখভাল করেন তিনি। এ কারণে মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় ক্লাবগুলোতে যাতায়াতকারীদের কাছে তিনি ক্যাসিনো সাঈদ নামে পরিচিত।

স্থানীয়রা জানান, মমিনুল হক সাঈকে সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর বানানোর পেছনে রয়েছেন যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ওরফে ক্যাসিনো সম্রাট।

সম্রাটকে ম্যানেজ করেই তিনি কাউন্সিলর প্রার্থী হন। অন্য দলের যারা প্রার্থী ছিলেন তাদের বেশির ভাগকেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। নিজ দলের যারা প্রার্থী ছিলেন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো হয় টাকার বিনিময়ে।

যাদের টাকার বিনিময়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন- সাবেক ছাত্রনেতা পলাশ মজুমদার এবং মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী সাব্বির হোসেন।

এই দু’জনের মধ্যে পলাশকে দেয়া হয় ৫ লাখ টাকা। তাছাড়া নির্বাচনে তিনি একাধিক ডামি প্রার্থীও দাঁড় করান। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আবদুর রহমান। তিনি ঘুড়ি প্রতীকে নির্বাচন করেন।

কাউন্সিলর হওয়ার পর সাঈদের দৌরাত্ম আরও বেড়ে যায়। জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ভবন দখল করে গড়ে তোলেন টর্চার সেল। তার হুকুম কেউ তামিল না করলেই টর্চার সেলে এনে নিপীড়ন করা হয়।

কাউন্সিলর হয়ে সম্রাটের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করেন সাঈদ। সম্রাটের ঢাকার ক্যাসিনোগুলো দেখভালের দায়িত্ব ছিল তার।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও ফকিরেরপুল ইয়াংমেনস ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনোর ছড়াছড়ি। এর মধ্যে ইয়াংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্রাটের শিষ্য খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বাকি পাঁচটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন সম্রাটের লোকজন।

সম্রাটের ক্যাসিনোর দেখাশোনা করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। তারা এক বছর আগে পল্টনের প্রীতম–জামান টাওয়ারে ক্যাসিনো চালু করেছিলেন। অভিযান শুরু হওয়ার পর মমিনুল সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান।

এদিকে ডিএসসিসি সূত্র জানায়, কাউন্সিলর হলেও সিটি কর্পোরেশনে বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকতেন সাঈদ। ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে গত জুন পর্যন্ত ডিএসসিসিতে ১৮টি বোর্ড সভা হয়। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৫টি সভায় উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিলর মমিনুল হক। ডিএসসিসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনি তা মানেন না। গত ২৫ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, পরপর তিনবার বোর্ড সভায় অনুপস্থিতি কাউন্সিলর পদ থেকে অপসারণযোগ্য অপরাধ এবং অসদাচরণের শামিল। বিষয়টি উল্লেখ করে গত ৭ জুলাই তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী নেতার তদবিরে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।

গত ২৩ জুন বিনা অনুমতিতে মমিনুল হকের বিদেশ ভ্রমণ আটকাতে পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ পুলিশ সুপারকে চিঠি দেয় ডিএসসিসি। অথচ কিছুদিন আগেও তিনি আবার বিনা অনুমতিতে সিঙ্গাপুরে গেছেন বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির সচিব মোস্তফা কামাল মজুমদার।

প্রসঙ্গত মমিনুল হক সাঈদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। পারিবারিক ঝামেলার কারণে ২০০২ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। এর পর মতিঝিলের দিলকুশা সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সামনের সড়কে দোকানদারি শুরু করেন। চোরাই তেলের ব্যবসাও করতেন।

থাকতেন বঙ্গভবনের চার নম্বর গেটের কোয়ার্টারে। সেখানে তার মামা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর চাকরি করতেন। পরে মোহামেডান ক্লাবে হাউজি খেলার সময় আলমগীর ও তাপসের ফুটফরমায়েশ খাটতেন। ২০০৭ সালের পর যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার সখ্য হয়।

তার হাত ধরেই সাঈদ ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি হন। পরে যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক হন। এর পর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। ওয়ার্ডে তার পদে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় হাসান উদ্দিন জামালকে।

ক্যাসিনো সাঈদের সেকেন্ড-ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করতে থাকেন জামাল। জামালের মাধ্যমেই আরামবাগ ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব, ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো-জুয়ার আসর বসাতেন সাঈদ।

এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ভবনে টেন্ডারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে জামালের পাশাপাশি কামরুল হাসান রিপন ছিল সাঈদের অংশীদার।

সাঈদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোবাণিজ্যের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগও আছে। প্রভাব খাটিয়ে বনে গেছেন বিভিন্ন ক্লাবের নেতা।