রোহিঙ্গাদের অবশিষ্টাংশকেও টার্গেট করছে মিয়ানমার

3090
রোহিঙ্গাদের অবশিষ্টাংশকেও টার্গেট করছে মিয়ানমার

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেককে অব্যাহতভাবে কলঙ্কের মাঝে রেখে বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা গাদাগাদি করে বসবাস করছে। দক্ষিণ রাখাইন রাজ্যে নিজেদের বসতভিটা থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জাতিগত নিশ্চিহ্নের অভিযান শুরু হওয়ার পর দু’বছর কেটে গেলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। এটি সম্ভবত এই কারণে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ সরকার- উভয়ের আচরণ ও আলোচনায় মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি স্থায়ী বিষয় হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা কখনও হতে পারে না। অন্যদিকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমিতে পুনর্বাসিত করার নানামুখী ‘পরিকল্পনার’ নামে বাংলাদেশ ও বাকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তামাশা করছে।

সমস্যা হল, যেসব রোহিঙ্গা তাদের বসতভিটায় ফিরে যেতে ইচ্ছুক, তাদের বেশিরভাগই সেখানে ফিরে যেতে সক্ষম হবেন না; কারণ ওই বসতভিটার বেশিরভাগ এরই মধ্যে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সুতরাং তাদের ফিরে যেতে হবে সরকার কর্তৃক নির্মিত কিছু ক্যাম্পে- যাকে বলা হবে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের ক্যাম্প এবং সম্ভবত সেগুলো পরিচালনা ও দেখাশোনা করবে ওই একই মানুষ, যারা মূল ’জাতিগত নিধন অভিযান’ পরিচালনা করেছিল।

এখনও মিয়ানমারে থেকে যাওয়া ১০ লাখ রোহিঙ্গার একটি অংশ- ১ লাখ ২৮ হাজারকে গত বছরের শেষ পর্যন্ত এ ধরনের ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল, যা অনেকটা যুদ্ধবন্দিদের আটকে রাখার ক্যাম্পের মতো। মিয়ানমার সরকার ওই ক্যাম্পগুলোর অবস্থা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চাপের কাছে শেষ পর্যন্ত বশীভূত হলেও এরই মধ্যে ওইসব এলাকায় প্রায় সম্পূর্ণরূপে আবাসন পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে সেগুলো ’বন্ধে’র ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু একই এলাকায় মানুষ এখনও কার্যত বন্দি অবস্থায়ই রয়েছে। সেখানে তাদের কোনো ভ্রমণের অধিকার নেই, নেই বেশিরভাগ জরুরি সেবা এবং তাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে চাকরি থেকেও।

সম্প্রতি প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল সাইবার পলিসি সেন্টার কর্তৃক নেয়া রাখাইন রাজ্যের স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণ করে অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউটের শিউরে ওঠা তথ্যাবলি বলছে, মিয়ানমার সরকার পরিত্যক্ত বা জ্বালিয়ে দেয়া রোহিঙ্গা গ্রামগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়ার কর্মকাণ্ডে এখনও লিপ্ত। গত ছয় মাস বা তার কাছাকাছি সময়ে নেয়া প্রায় ৪০০ স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ বাংলাদেশ থেকে ফেরত আসতে যাওয়া রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করার জন্য তথাকথিত প্রস্তুতি যৎসামান্য পর্যায়ে।

এটি এমন একটি রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না, যে কিনা বোঝে সে নিজের স্বদেশি একটি জাতির বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটন করেছে এবং বিষয়টির সংশোধনের পথ খুঁজছে। বরং এটি এমন একটি দেশের আচরণ, যে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের দৃশ্যমান সব নিদর্শন মুছে ফেলার চূড়ান্ত আঁচড় দিয়ে যাচ্ছে, যাতে বোঝা না যায় সেখানে কখনও রোহিঙ্গারা ছিল।

মিয়ানমারের কৌশল সম্পূর্ণ পরিষ্কার- বাহ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক চাপের কাছে মাথা নত হওয়া, শরণার্থী বা তাড়িয়ে দেয়া রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য ’অনেক পরিকল্পনা’ করা, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি-সমঝোতাগুলো মেনে চলা এবং আরও নানা কিছু। অন্যদিকে আচরণে তারা ইঙ্গিত দিচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার কিছু নেই এবং তারা যদি ফিরে যায় তবে তারা সেখানে নিরাপদ থাকবে না। আর রোহিঙ্গারা যদি স্পর্শকাতর কিছু করে এবং স্বেচ্ছায় পুনর্বাসনে ফিরে যেতে অস্বীকার করে, তবে তাদের ব্যাপারে মিয়ানমার নিজেদের দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে।

আপাতত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এ কারণে অখুশি যে, রোহিঙ্গারা দক্ষিণ রাখাইন রাজ্যে তাদের ফেলে আসা ভূমির দাবি এখনও করতে পারছে। কিন্তু যখন তাদের গ্রামগুলোর চিহ্ন মুছে ফেলা হবে এবং যত বেশি সময় গড়িয়ে যাবে, দেশটিতে থেকে যাওয়া সামান্য রোহিঙ্গার ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগ ও পালিয়ে যেতে বাধ্য করা যাবে। আর যখন রোহিঙ্গা জনসংখ্যার বেশিরভাগ সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে ’স্থানীয়’ হয়ে যাবে এবং বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তখন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নিজেদের পূর্বপুরুষদের ভূমি এবং তারা সেখানকার নাগরিক ও সেখানে জন্মেছে বলে যে দাবি করে, তা সফলতার সঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যাবে।

রুয়ান্ডায় উন্মত্ত হত্যার মতো গণহত্যার উপাখ্যান খুব কমই দেখা যায়। গণহত্যার মূলকথা হল একটি পরিচয়কে হত্যা করা, যেমনটি ওই পরিচয়ধারী মানুষকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে করা হয়। মিয়ানমার বর্তমানে পাইকারি হারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা করছে না; বর্তমানে তাদের বেশিরভাগকে সফলতার সঙ্গে সীমান্ত ছাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে তারা সক্ষম হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ঠাণ্ডা মাথায় রোহিঙ্গা পরিচয়সংশ্লিষ্ট সবকিছু ধ্বংস করছে এবং নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে তাদের ইতিহাস, যা এখনও মিয়ানমারের নাগালের মধ্যে রয়েছে।