রোহিঙ্গা সন্ত্রাস দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান

3090
রোহিঙ্গা সন্ত্রাস দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান

কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। হোয়াটসঅ্যাপ-ভাইবারে তারা যোগাযোগ স্থাপন করছে দেশ-বিদেশে। পরিচয় গোপন করে তৈরি করছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট। আর এই পাসপোর্টে বিদেশ গিয়ে তারা লিপ্ত হচ্ছে নানা অপকর্মে। মাদক পাচারে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

জড়িয়ে পড়েছে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, মানবপাচার এবং ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। অনুমতি ছাড়াই করছে সভা-সমাবেশ। রোহিঙ্গা শিবিরে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলেও তথ্য আছে গোয়েন্দাদের কাছে। তাই রোহিঙ্গাদের এসব সন্ত্রাসী কার্যকলাপে উদ্বিগ্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে এসব তথ্য। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ স্থানীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের জন্য পৃথক পুলিশ স্টেশন, পুলিশ ইনভেস্টিগেশন সেন্টার, ক্যাম্পজুড়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনবল বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে কক্সবাজার জেলা পুলিশের। সংশ্লিষ্টরা জানান, রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে এই মুহূর্তে কেবল বিশেষ দুটি ইউনিটেরই প্রয়োজন ১ হাজার ৬০০ জনবল।

কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছে মাত্র ৪০০ জনবল। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-এপিবিএনের একটি ইউনিটের মাধ্যমে ওই সদস্যরা কাজ করছে। ওই ইউনিটের নাম এপিবিএন-১৪।

এই জনবল দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাদের এসব সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দমনে তাই সরকারের পক্ষ থেকে শিগগিরই সেখানে গঠন করা হচ্ছে এপিবিএনের আরও একটি ইউনিট। সেটির নাম হবে এপিবিএন-১৬। এর জন্য চাওয়া হয়েছে নতুন ৮০০ জনবল।

এই প্রস্তাব পাস হলে এপিবিএনের এক হাজার ২০০ জনবল একযোগে কাজ শুরু করবে। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুল ইসলাম মঙ্গলবার বিকালে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। পৃথক ব্যাটালিয়নের বিষয়টি এখন সচিব কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে এপিবিএনের নতুন ইউনিট সেখানে কাজ শুরু করবে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি এসএম আক্তারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালে যখন ব্যাপক হারে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আসা শুরু করে তখন পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে জনবল সেখানে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করি।

পরে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন জনবল সৃষ্টির উদ্যোগ নিই। সে অনুযায়ী সেখানে একটি এপিবিএনের ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়।

গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অনুমোদন পাওয়া এই ইউনিট কাজ শুরু করে ২৭ ডিসেম্বর। এর জনবল ৫৮৮ (কর্মরত ৪০০)। কিন্তু এই জনবল দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরেকটি পৃথক ইউনিট গঠনের প্রয়োজন বোধ করেন। সে অনুযায়ী গত বছর এপিবিএন-১৬ গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়।

এটি এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ছাড় দিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী দুই মাসের মধ্যেই নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, পদ থাকার পরও এপিবিএন-১৪-তে ২০০ জনকে পদায়ন করা সম্ভব হয়নি।

তাই নতুন ইউনিটের জন্য ৮০০ জনবল চাওয়া হয়েছে। এখন এপিবিএনের যে ইউনিট আছে সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন এসপি। নতুন ইউনিটেরও নেতৃত্ব দেবেন একজন এসপি পর্যায়ের কর্মকর্তা।

অতিরিক্ত ডিআইজি আক্তারুজ্জামান বলেন, কেবল এপিবিএনই নয়। জেলা পুলিশের জন্য নতুন করে এক হাজার জনবল চেয়ে শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয়া হবে। বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশের আইজি অবগত আছেন। এরই মধ্যে কক্সবাজার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি প্রস্তাব পুলিশ সদর দফতরে এসেছে। এ প্রস্তাব পাস হলে রোহিঙ্গা মনিটরিং করা পুলিশের জন্য সহজ হবে। তাছাড়া বিভিন্ন মামলা তদন্তের জন্য সুবিধা হবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেখানে পুলিশের জনবলের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।

এপিবিএন-১৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত এসপি) মোহাম্মদ রাকিব খান যুগান্তরকে বলেন, আমরা দায়িত্ব পাওয়ার আগে থেকেই পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের প্রায় সাড়ে ৩০০ ফোর্স রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করত। নতুন ইউনিট গঠনের পর আমরা এখানে কাজ শুরু করি।

কিন্তু স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি না। কারণ এখনও এ সংক্রান্ত নীতিমালা হয়নি। তাই আমাদের জেলা পুলিশের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে। আমাদের অনুমোদিত জনবলের ২০০ জন ঘাঁটিতে আছে।

যা-ও আছে তাদের মধ্যে থেকে অনেকে জেলা পুলিশের সঙ্গে কাজ করছেন। তাই আমাদের ব্যাটালিয়নে জনবল বাড়ানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি নতুন ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের তুলনায় এখানে পুলিশের জনবল খুবই কম। দুটি ব্যাটালিয়নের জন্যই এখানে কমপক্ষে এক হাজার ৬০০ জন জনবল প্রয়োজন।

এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত এসপি রাকিব খান বলেন, দিনে দিনে রোহিঙ্গা ইস্যু জটিল হয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এখানে যেসব এনজিও কাজ করছে তাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখানে অনেক নারী রোহিঙ্গা আছে।

কিন্তু সে অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত নারী সদস্যকে এখানে নিয়োগ দেয়া দরকার। কিন্তু এপিবিএন-১৪-তে কোনো নারী সদস্যকে পদায়ন করা হয়নি। এছাড়া রোহিঙ্গাদের অপরাধ ঠেকাতে আশ্রয় শিবিরগুলোর চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আড়াই থেকে তিন ফুট ইটের গাঁথুনির ওপর এ প্রাচীর নির্মাণ হবে। এর আগে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তায় চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুশাসন দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাতের আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শুরু হয় সশস্ত্র পদচারণা। গত দুই বছরে রোহিঙ্গা শিবিরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন রোহিঙ্গা।

এই সময়ে ’বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ৩২ জন রোহিঙ্গা। একাধিক সূত্র জানায়, টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরে রোহিঙ্গাদের সাতটি করে সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। টেকনাফের ’আবদুল হাকিম বাহিনী’ বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য যখন-তখন লোকজনকে অপহরণ করে।

মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করে লাশ গুম করে। ইয়াবা, মানবপাচারে যুক্ত থাকার পাশাপাশি এ বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা নারীদের তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটায়।

২০১৬ সালের ১৩ মে টেকনাফের মুছনী রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায় হাকিম বাহিনী। এ সময় আনসার কমান্ডার আলী হোসেন তাদের গুলিতে নিহত হন। তারা লুট করেছিল আনসারের ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৭ শতাধিক গুলি।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা এলাকায় যুবলীগ নেতা ওমর ফারুককে (২৪) গুলি করে হত্যা করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

ফারুক হ্নীলা ইউনিয়ন যুবলীগের ৯নং ওয়ার্ড সভাপতি ও জাদিমুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। রোববার রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ ফারুকের ভাইদের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদিনও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। প্রায় প্রতিদিনই নানা ধরনের ঘটনা ঘটছে।

এছাড়া ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, মাদক ও মানবপাচারসহ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪৭১টি। এর মধ্যে মাদক মামলা ২০৮, হত্যা মামলা ৪৩ ও নারী সংক্রান্ত মামলা ৩১টি। এসব মামলায় আসামি ১ হাজার ৮৮ জন রোহিঙ্গা।