সম্রাট কি অধরাই থেকে যাচ্ছেন?

3090
সম্রাট কি অধরাই থেকে যাচ্ছেন?

রাজধানীতে হঠাৎ 'ক্যাসিনো-ঝড়' আছড়ে পড়েছে। সেই ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে অবৈধ জুয়ার আসর। মতিঝিল, পল্টন, ফকিরাপুল, কাকরাইল এলাকায় কমে গেছে জুয়াড়িদের আনাগোনা। রাত-বিরাতে যেসব ক্লাবে নিয়মিত চলত মদ-জুয়ার আসর, সেখানে এখন ভর করছে আতঙ্ক। সরকারের ক্যাসিনোবিরোধী ঝড়ে অনেকের সাজানো ঘর তছনছ হয়ে গেলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন অনেক ক্যাসিনো গডফাদার।

বিশেষ করে ক্যাসিনোকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ''ক্যাসিনো-গুরু'' ও যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট এবং তার ঘনিষ্ঠদের এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যদিও দীর্ঘদিন ধরে তারাই রাজধানীর ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে কোটি কোটি টাকার বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। সম্রাট গোয়েন্দা জালে আটকা পড়েছেন বলা হলেও তার অবস্থান নিয়ে চলছে লুকোচুরি। কেউ বলছেন- দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন সম্রাট। কেউ বলছেন- প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে দেশেই আছেন।

১৮ অক্টোবর অভিযান শুরুর পর কেটে গেছে ১৫ দিন। এই সময়ে ক্যাসিনো সম্রাটের বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রত্যেকেই ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ রাজধানীতে নানা অপরাধের সঙ্গে সম্রাটের জড়িত থাকার কথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছেন। গত ১৫ দিনে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু সম্রাটকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।

সম্রাটকে গ্রেফতারের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। তাকে গ্রেফতার করা হবে কী হবে না সেটি নিয়েও দোলাচল কাটছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য- সম্রাট গোয়েন্দা জালে আটকা। তা হলে গ্রেফতার কেন করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। এদিকে সম্রাটকে গ্রেফতার নিয়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্যও অনেকটাই কৌশলী।

সবশেষ বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ''আমি বলছি ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন। আমি কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে কিছু বলব না। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করব।''

এদিন ওবায়দুল কাদের গরম খবরের কথাও বলেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ''অপেক্ষা করুন, গরম খবর আসছে।'' তবে কী সেই গরম খবর, সে বিষয়ে কিছুই স্পষ্ট করেননি মন্ত্রী। কী ধরনের খবর- সাংবাদিকরা তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কী ধরনের খবর, সেটা বলে দিলে তো হয় না। সময় এলেই জানতে পারবেন।

এর পর সাংবাদিকরা আবারও জানতে চাইলে তিনি বলেন, ''সারপ্রাইজ থাকল।''

ওবায়দুল কাদের বলেন, চাঁদাবাজ, ক্যাসিনো পরিচালনাকারী ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার হবে।

এর পর অনেকেই ধরে নেন, ঢাকার ক্যাসিনো গডফাদার ইসমাইল হোসেন সম্রাট গ্রেফতার হচ্ছেন, এটিই ওবায়দুল কাদেরের গরম খবর।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যে যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন নাকি বিদেশে চলে গেছেন? এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমি তো বলেছি- ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন; দেখতে পাবেন।

ক্যাসিনো সম্রাটের গ্রেফতার-ই ওবায়দুল কাদেরের গরম খবর বলে অনেকেই অনুমান করছেন। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সেই গরম খবরের দেখা নেই।

একটি সূত্র বলছে, আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার নাও হয়ে পারেন। তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, সম্রাট প্রভাবশালী মহলকে ''ম্যানেজ'' করতে পেরেছেন। সম্রাট বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তিনি ছাড়া ঢাকায় সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম সাংগঠনিকভাবে মোকাবেলা করা কঠিন হবে। এ ছাড়া তার সুবিধাভোগী নেতারাও আতঙ্কে আছেন এই ভেবে যে, সম্রাট গ্রেফতার হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সম্রাটের সুবিধাভোগীদের তালিকায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, পুলিশ, সাংবাদিকসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তিই আছেন। এ কারণে তাকে গ্রেফতারে ইতস্তত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাকে কোনো মামলায় আসামিও করা হয়নি। অনেকে বলছেন, সম্রাট গ্রেফতার না–ও হতে পারেন।

ঢাকায় ক্লাব ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্ত ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে গ্রেফতারের বিষয়ে লুকোচুরি খেলা চলছে। কয়েক দিন ধরেই তিনি গোয়েন্দাজালে আটকে আছেন।

সম্রাট আটক হয়েছেন কিনা সেটি নিশ্চিত হতে গত দুদিন ডিএমপি ও ডিবি কার্যালয়ে মিডিয়াকর্মীদের ভিড় ছিল। কিন্তু পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থা কেউ-ই এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সম্রাটকে গ্রেফতার করা হবে কিনা সেটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী- এমনকি প্রশাসন এখনও পরিষ্কার নয়। সাধারণত রাজনৈতিক নেতা গ্রেফতারের আগে ওপরের মহলের একটা ইশারা লাগে। এখনও সেই সবুজ সংকেত পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ কারণে তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না।

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বুধবার দেশে ফিরেন। তাকে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ক্যাসিনোবাণিজ্যে অভিযুক্তদের বিভিন্ন সময় আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার জন্য দলের কিছু নেতাকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, ''বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের জন্য কেউ কোনো তদবির নিয়ে আসবেন? কাউকে বাঁচাতে চাইবেন?- আমি কিছু করতে পারব না।''

দলীয় নেতাদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, কে কী করেছেন আমি সব জানি। অপরাধীদের কেউ শেল্টার দেয়ার চেষ্টা করবেন না। এ সময় তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ''ক্যাসিনো খেলেন? ক্যাসিনো ব্যবসা করেন? আমি ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের জন্য ভাসানচরে থাকার ব্যবস্থা করব।''

প্রধানমন্ত্রীর এমন কড়া অবস্থানের পরও গ্রেফতার হচ্ছেন না সম্রাট। এ কারণে নানা প্রশ্ন উঠে আসছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্রাট এখন নিরাপদ অবস্থানে রয়েছেন। তিনি পরিবার ও দলীয় লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। দুদিন আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সম্রাট গ্রেফতার এড়াতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির করার পাশাপাশি নিজের অসুস্থতার বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। এ কারণে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ চান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো সম্রাটের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলছে না। ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের পক্ষ থেকেও তাকে গ্রেফতার করা হবে কিনা সেটি নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হচ্ছে না। এ বিষয়ে কৌশলী উত্তর দিচ্ছেন সরকারের মন্ত্রীরা। তবে সম্রাট গোয়েন্দাজালে আছেন- এ বিষয়ে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে তাকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হবে কিনা, এ নিয়ে জনমনে সেই পুরনো সন্দেহ ফের উঁকি দিচ্ছে।

এদিকে ক্যাসিনোকাণ্ডে যাদেরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তারাই সম্রাটের নাম বলছেন। তার সহযোগী হিসেবে নাম আসছে যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, কাউন্সিলর ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক ওরফে সাঈদ, যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক ওরফে আরমানসহ আরও কয়েকজনের। এর মধ্যে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগ নেতা জিকে শামীম, কৃষক লীগের নেতা শফিকুল আলম ও মোহামেডান ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য কেউ গ্রেফতার হননি।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামে সম্রাটের পক্ষে তদবির চলছে। কয়েকজন নেতা বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, সম্রাট গ্রেফতার হলে ঢাকায় সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়বে। বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রাম রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করাটা কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টি কিছুটা আমলে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এ কারণেই তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। যুবলীগের আরেক নেতা খালেদ মাহমুদের গ্রেফতারের পরই তাকে গ্রেফতারের কথা ছিল।